গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং মৌলবাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদ, স্বৈরতন্ত্রের পতন হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আও্যামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর মধ্য দিয়েই ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে পুনর্জন্ম ঘটে মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির।
গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল দেশকে জিহাদিস্তান বানানোর একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। কারণ হিসেবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকেই দেশে আকস্মিক উত্থান লক্ষ্য করা যায় ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর। একযোগে তাঁরা নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
সারাদেশে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মন্দিরে হামলা, ধর্মান্তকরণ, দরবার, আখড়াগুলোয় উগ্র মবের আকস্মিক আক্রমণ; বাউল, সুফি, সাধকদের জীবনকে বিপন্ন হতে থাকে। এমনকি ভিন্নমত, ধর্ম, গোত্র, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী এবং সংশয়বাদীদের ওপর চলে উপর্যুপরি আক্রমণ। মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার বিষবাষ্পে আক্রান্ত হতে থাকে দেশ ও জনপদের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী।
স্বাধীনতা, ন্যায্য অধিকার ও গণতন্ত্র বিপন্ন হতে থাকে। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, চরমোনাই, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—এমন জিহাদি গোষ্ঠীগুলো একে একে একই আলোর নিচে আসতে শুরু করে। ইসলামী ঐক্যজোট নামে দেশব্যাপী ইসলামী চরমপন্থা ও উগ্রবাদ পরিচালনার একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় নির্বাচনী জোটের ব্যানারে।
ইসলামী আইন বাস্তবায়ন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই—এই ব্যানারে সারাদেশে জঙ্গিবাদ, চরমপন্থা ও উগ্রবাদের উন্মাদনা তৈরি হয়। রাজধানী ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কলেমাখচিত কালো পতাকা হাতে মিছিল দেখা যায়। এবং বেশ কিছু জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর।
এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারি দলের ভূমিকায় এবং মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলের ভূমিকায়।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ৫৭ হাজার বর্গমাইল জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা-সহ এসব কার্যক্রমে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।
বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জঙ্গিবাদ ও গ্রেনেড হামলার মামলায় ছিলেন দণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি। তৎকালীন সময়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় ছিল জঙ্গিবাদের হেরেমখানা। এমনকি সেখানে বিভিন্ন জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সারাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন তারেক রহমান। বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের প্রতিবেদনে এমনসব স্পর্শকাতর বিষয় উঠে এসেছে। সেসব প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে জঙ্গিবাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, সারাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী জঙ্গিবাদের মহড়া দৃশ্যমান হওয়ার পরও জামায়াতে ইসলামীর মতো উগ্রবাদী ইসলামী দলটির সংসদে অবস্থান আগামী বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও দেশের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের যে পুরোনো রাজনৈতিক সন্ধি ২০০১–২০০৬ চারদলীয় জোটের ব্যানারে ছিল, সেখানে জঙ্গিবাদের উত্থানের গল্পটা ভিন্ন মাত্রা পাবে পুনরায়।
